Deshdeshantor24com: Bangla news portal

ঢাকা শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪

সফল হতে হলে হেরে যাবার মানসিকতা রাখা জরুরী

সফল হতে হলে হেরে যাবার মানসিকতা রাখা জরুরী

শিবু দাশ সুমিত

জীবন সুন্দর। জিততে শেখার চেয়ে বেশি জরুরী হলো হেরে গেলে সেটি মেনে নেবার মানসিকতা। আশা- দুই অক্ষরের একটি শব্দ হলেও কী অসীম তার শক্তি, এর কোন শেষ নেই, নেই কোন সীমানা। আশার পালে ভর করেই মানুষ তার পুরো একটি জীবন পার করে দিতে পারে। গ্রিক মিথোলজি বলে রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা, আশা, জরা, ব্যাধি, দুর্ভিক্ষ, লোভ, লালসা, কামনা, বাসনা, প্লেগ, হিংসা, বিদ্বেষে পূর্ণ এক বক্স থেকে শুধুমাত্র আশা ব্যতীত সবকিছুই পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে। আটকে পড়া আশা নিয়েই মানুষ তার জীবনের বাকি পথটুকু পাড়ি দিচ্ছে।

মানুষ স্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে আর আশায় বুক বাঁধে সচেতনভাবে। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় বটে তবে আশা আমৃত্যু বেঁচে থাকে। আপনি এই মুহূর্তে কোথায় আছেন সেটা জরুরী নয়, আসলে আপনি কোথায় যেতে চান সেটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ঘাত-প্রতিঘাত অসংখ্যবার আসবে তাই বলে ভেঙ্গে পড়া যাবে না। জিততে শেখার চেয়ে বেশি জরুরী হলো হেরে গেলে সেটি মেনে নেবার মনমানসিকতা এবং ঠিক এই জায়গাতেই আমরা বারবার হেরে যায়! আশা বা স্বপ্ন যাই বলি না কেন, তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে। কারণ বিশ্বাস এক অদ্ভুত, বিপুল শক্তি, এটা কোন ম্যাজিক বা অলৌকিক বিষয় নয়। বাইবেলে আছে টপ অব দ্যা হিলে সবসময় একা যেতে হয়। আপনি যখন কোন পর্বত শৃঙ্গের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করবেন তখন কিন্তু কেবল আপনিই সেখানে অবস্থান করতে পারবেন। হয়তো এই কারণেই তেনজিং এবং হিলারি সর্বোচ্চ শিখরে একসাথে অবস্থান করতে পারেননি।
 
সুতরাং আপনার কাজ আপনাকেই করতে হবে এবং এই পথে আপনি একজন রাজার মতোই অসম্ভব একা। রাজা নিঃসঙ্গ, কারণ সিংহাসন তো একটি। আর একই সিংহাসনে একসাথে দুইজন বসতে পারেন না।
 
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়ঃ
বালি ভেজা পায়ে, জুতার ঘর্ষণে, রক্তের ক্ষরণে
রোদে ভেজা শরীরেতে- খড়ি ফোটে পুরানো চামড়ায়।
অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে
অভিলাষে জেগে থাকে মন
স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রতীক্ষায়…
 
এই পৃথিবীতে সবাই জিততে আসেনি আর একসাথে সবার জয় হবে সেটা আদতে সম্ভবও নয়। কেউ জিতবে আবার কেউ হারবে। হার বা জয় পাশাপাশি আছে বলেই তাদের একটির গুরুত্ব বেশি এবং অন্যটির অধিকাংশের দৃষ্টিতেই একটু কম। সফলতার বিপরীত শব্দই কিন্তু ব্যর্থতা। চাণক্যের মতে, ব্যর্থতা নিয়ে কখনই আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। জীবনে সাফল্য এবং ব্যর্থতা পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত। ব্যর্থতা আসলে জীবনে সাফল্য আসবেই। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন যে ছোটকাল থেকেই শেখানো হয় তোমাকে প্রথম হতে হবে বা তোমাকে অবশ্যই জিততে হবে। সেই থেকে যে জীবনের অসীম দৌড় শুরু হয় সেটি শেষদিন পর্যন্ত চলতে থাকে। মন খারাপের সময় যখন আমাদের উচিত মানুষটার পাশে দাঁড়ানোর, তখন আমরা সব আক্রোশ নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। অমুক পারলে, তুমি পারলে না কেন? এই তুলনায়, এই প্রশ্নে, এই অনন্ত চাপে, এই অপমানে, এই লজ্জায়, এই গ্লানিতে অনেকে জীবনকে চিরতরে ছুটি দিয়ে দেয়। আমরা সবসময় সাফল্যের চিন্তায় মগ্ন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে হবে, সবার চেয়ে ভালো করতে হবে, বড় চাকরি পেতে হবে; ব্যস তুমি সফল। পরিবার তথা সমাজের মুখ উজ্জ্বল করেছ। সবাইকে দিয়ে যে একই কাজ হবে না আমরা সেটাই প্রায় বুঝতে চাই না। সবার পেশা বা ইচ্ছাও কখনো এক হবে না। এখানে কেউ কবিতায় তার সুখ খুঁজে নেবে, কেউ গানে গানে হারাবে, কেউ মেঘ হবে আবার কেউবা রোদ্দুর হয়ে চারপাশ আলোকিত করবে। ইচ্ছের এতোটা বৈচিত্র আছে বলেই ধরণী এতো মায়াময়, এতো সুন্দর। ইচ্ছেরা ফুল হয়ে ফুটুক আর সুবাস হয়ে চারপাশ মুখোরিত করুক এটাই তো আমাদের চাওয়া উচিত।
 
সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতার পাঠও জরুরীঃ
আমরা যে আবেগ, চিন্তা, ভাবনা, মূল্যবোধ লালন বা ধারণ করি তার সবই আমরা কোথাও না কোথাও থেকে শিখেছি আর এর মাধ্যমেই আমরা দৈনন্দিন পরিচালিত হচ্ছি। সাফল্যের এই ধারণাটা বস্তুতপক্ষে আমার বা আপনার নিজের তৈরী নয় বরং এটা সমাজের তৈরি করে দেয়া কিছু রীতিনীতি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসার কারণে আপনার ধর্ম, আপনার সমাজ, আপনার সংস্কৃতি আপনাকে শেষ পর্যন্ত এটা বোঝাতে সমর্থ হয়েছে যে এটাই ঠিক এবং এটাই আপনাকে মেনে চলতে হবে বা এর থেকে আপনি কখনো ভিন্ন পথে যেতে পারবেন না। আপনার অঢেল অর্থ, অপরিসীম ক্ষমতা; তার মানে এই না যে আপনি আপনার জীবনে সফল একজন মানুষ। ব্যক্তিভেদে আসলে এই সফলতা বা ব্যর্থতার অর্থে ভিন্নতা দেখা যায়। আপনি কী পেলেন আর কী পেলেন না; তার উপরও এই পৃথিবীতে আপনার সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে না। অন্য কারোর চিন্তাধারার দাস হয়ে না উঠা, নিজের ভালোলাগার কাজটা করা, নিজের সুখের জায়গাটার সাথে প্রতারণা না করা; সেটাই প্রথম এবং প্রধান সাফল্য। আপনি জীবনে সফল যখন আপনি জানেন কীভাবে আনন্দের সাথে চলতে হয়, যতটুকু আছে তা দিয়েই আপনার সব চাহিদা মেটানো সম্ভব তা সে নরকের মধ্যে দিয়ে হলেও। বলা যায় কেউ প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থ হয় না, হাল ছেড়ে দিলে বা ধৈর্য হারিয়ে ফেললেই শেষ পর্যন্ত হার মেনে নিতে হয়। ধার করা একটা গল্প বলি;
 
একজন কৃষক ছিলেন যিনি হতাশ ছিলেন বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ তার ফসলের গুণাগুণ নির্ধারণ করে বলে। তো একদিন তিনি সৃষ্টিকর্তাকে ডাকলেন আর বললেন, "আমি প্রকৃতির নানান উদ্ভট কার্যকলাপে ক্লান্ত। সবকিছুই ভুল সময়ে হচ্ছে। আপনি এগুলো আমার হাতে ছেড়ে দিন।" সৃষ্টিকর্তা বেশ খোশমেজাজে ছিলেন, তো তিনি বললেন, "ঠিক আছে, আজ থেকে প্রকৃতি তোমার হাতে"। তারপর কৃষকটি তার ফসলের পরিকল্পনা করল। তো সে বৃষ্টিকে ডাকলো, "বৃষ্টি আয়!" আর বৃষ্টি চলে এলো। সে জমিতে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেখলো, "ঠিক আছে, ছয় ইঞ্চি অব্দি মাটি ভিজে গেছে", "বন্ধ হয়ে যা!" তারপর সে তার জমিতে লাঙ্গল চালিয়ে ভুট্টার বীজ পুঁতল এবং দু দিন অপেক্ষা করল, "বৃষ্টি!" তারপর "রোদ!" একদিন সে জমিতে কাজ করছিল, তাই "মেঘ!" সব কিছুই তার ইচ্ছামতো হল আর কৃষক ভাবলেন হয়তো ভুট্টার ফলনও এবার বেশ ভালো হবে। তিনি খুবই আনন্দে ছিলেন।
 
যখন ফসল কাটার সময় এলো, সে চেয়েছিল যাতে কোনো পাখি না আসে। সে খুব অবাক হলো যখন সে বলল "পাখি যেন না আসে” আর প্রথম থেকেই কোন পাখি সেখানে ছিল না। সে জমিতে গেল ফসল কাটতে কিন্তু যখন সে ফসলগুলোর দিকে তাকাল সেখানে দেখল যে গাছগুলোর মধ্যে কোন ফল আসে নি। তখন সে ভাবল "এটা কী উদ্ভট ব্যাপার? আমি কী ভুল করলাম?" সে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না কারণ সে সব কিছুই নিজে নিয়ন্ত্রণ করেছিল - বৃষ্টি,জল, আর রোদ - সব সঠিক ভাবে। সে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেল আর জিজ্ঞেস করল, "আমি সব কিছুই ঠিক ভাবে করেছি কিন্তু গাছে কোনো ফল আসেনি। আপনি কি আমার ফসল নষ্ট করেছেন?" সৃষ্টিকর্তা বললেন,"আমি সব কিছু দেখে চলেছি; তুমি নিয়ন্ত্রণ করছিলে তাই আমি হস্তক্ষেপ করতে চাইনি। বৃষ্টি ভালো ছিল, রোদ ভালো ছিল, সবকিছুই ভালো ছিল কিন্তু তুমি সব হাওয়া বন্ধ করে রেখেছিলে। আমি সবসময় খুব তীব্র ঝড় বাতাস পাঠাতাম যা ফসলগুলিকে বিপর্যস্ত করে দিত, তাতে তারা উপড়ে যাওয়ার ভয় পেতো, তাই তারা তাদের শিকড় মাটির আরও গভীরে পাঠাতো আর তাই ফসল ফলত। এখন তোমার ভালো ভুট্টা গাছ হয়েছে কিন্তু ফসল আসেনি।"
 
ব্যর্থতা আছে বলেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে শক্তিশালী করে নেয়া যায়। আপনার জীবনে যদি খারাপ সময় না আসে তবে পরিস্থিতি অনেকটা ভুট্টা গাছের মতই হতে পারে। মাঝে মাঝে হারতে হবে, স্থির হতে হবে, একটু থামার প্রয়োজন আছে; তাতে করে হয়তো কিছু ফুয়েল সঞ্চার করা যাবে পরবর্তী দিনগুলোর জন্য।
 

লেখক- সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, নড়াইল


ডব্লিউটি